চাঁদ পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহ এবং সৌর জগতের পঞ্চম বৃহত্তম উপগ্রহ। পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে চাঁদের কেন্দ্রের গড় দূরত্ব হচ্ছে ৩৮৪,৩৯৯ কিলোমিটার (প্রায় ২৩৮,৮৫৫ মাইল) যা পৃথিবীর ব্যাসের প্রায় ৩০ গুণ। চাঁদের ব্যাস ৩,৪৭৪.২০৬ কিলোমিটার (২,১৫৯ মাইল) যা পৃথিবীর ব্যাসের এক-চতুর্থাংশের চেয়ে সামান্য বেশি। এর অর্থ দাড়াচ্ছে, চাঁদের আয়তন পৃথিবীর আয়তনের ৫০ ভাগের ১ ভাগ। এর পৃষ্ঠে অভিকর্ষ বল পৃথিবী পৃষ্ঠে অভিকর্ষ বলের এক-ষষ্ঠাংশ। পৃথিবী পৃষ্ঠে কারও ওজন যদি ১২০ পাউন্ড হয় তা হলে চাঁদের পৃষ্ঠে তার ওজন হবে মাত্র ২০ পাউন্ড। এটি প্রতি ২৭.৩২১ দিনে পৃথিবীর চারদিকে একটি পূর্ণ আবর্তন সম্পন্ন করে। প্রতি ২৯.৫ দিন পরপর চন্দ্র কলা ফিরে আসে অর্থাৎ একই কার্যক্রম আবার ঘটে। পৃথিবী-চাঁদ-সূর্য তন্ত্রের জ্যামিতিতে পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তনের কারণেই চন্দ্র কলার এই পর্যানুক্রমিক আবর্তন ঘটে থাকে।
পৃথিবীতে অবস্থানকারী পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে চাঁদ ।
বিবরণ বিশেষণ চন্দ্রীয়
বিবরণ বিশেষণ চন্দ্রীয়
কক্ষপথের বৈশিষ্ট্য
অর্ধ-মুখ্য অক্ষ ৩৮৪,৩৯৯ কিমি (0.00257জ্যোএ)
উৎকেন্দ্রিকতা ০.০৫৪৯
গড় কক্ষীয় দ্রুতি ১.০২২ কিমি/সে (২২৮৬ মাপ্রঘ)
নতি ভূ-কক্ষের সাথে ৫.১৪৫° (পৃথিবীর বিষুবের সাথে ১৮.২৯° এবং ২৮.৫৮° -এর মধ্যে)
উদ্বিন্দুর দ্রাঘিমা পশ্চাদপসরমান, ১৮.৬ বছরে একবার আবর্তন
যার উপগ্রহ পৃথিবী ভৌত বৈশিষ্ট্যসমূহ
গড় ব্যাসার্ধ ১,৭৩৭.১০৩ কিমি (পৃথিবীর ০.২৭৩ গুণ)
বিষুবীয় ব্যাসার্ধ্য ১,৭৩৮.১৪ কিমি (পৃথিবীর ০.২৭৩গুণ)
মেরু ব্যাসার্ধ্য ১,৭৩৬.০ কিমি (পৃথিবীর ০.২৭৩ গুণ)
পৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল ৩.৭৯৩×১০৭ কিমি² (পৃথিবীর ০.০৭৪ গুণ)
আয়তন ২.১৯৫৮×১০১০কিমি³ (পৃথিবীর ০.০২০ গুণ)
ভর ৭.৩৪২×১০২২ কেজি (পৃথিবীর ০.০১২৩ গুণ)
গড় ঘনত্ব ৩,৩৪৩.০ কেজি/মি৩
বিষুবীয় পৃষ্ঠের অভিকর্ষ ১.৬২ মি/সে২ (০.১৬৫৪ জি)
মুক্তি বেগ ২.৩৮ কিমি/সে (৫৩২৪ মাপ্রঘ)
নাক্ষত্রিক ঘূর্ণনকাল ২৭.৩২১ ৫৮২ দিন (সঙ্কালিক)
বিষুবীয় অঞ্চলে ঘূর্ণন বেগ ৪.৬২৭ মি/সে (১০.৩৪৯ মাপ্রঘ)
অক্ষীয় ঢাল ভূ-কক্ষের সাথে ১.৫৪২৪°
প্রতিফলন অনুপাত ০.১২
পৃষ্ঠের তাপমাত্রা
বিষুব (ন্যূন ১০০ কে) (মধ্যক ২২০ কে) এবং (সর্বোচ্চ ৩৯০ কে)
৮৫°উ (ন্যূন ৭০ কে) (মধ্যক ১৩০ কে) এবং (সর্বোচ্চ ২৩০ কে)
আপাত মান (−১২.৭৪ পর্যন্ত)
কৌণিক ব্যাস (২৯′ থেকে ৩৩′)
বেরিকেন্দ্র নামে পরিচিত একটি সাধারণ অক্ষের সাপেক্ষে পৃথিবী এবং চন্দ্রের ঘূর্ণনের ফলে যে মহাকর্ষীয় আকর্ষণ এবং কেন্দ্রবিমুখী বল সৃষ্টি হয় তা পৃথিবীতে জোয়ার-ভাটা সৃষ্টির জন্য অনেক অংশে দায়ী। জোয়ার-ভাটা সৃষ্টির জন্য যে পরিমাণ শক্তি শোষিত হয় তার কারণে বেরিকেন্দ্রকে কেন্দ্র করে পৃথিবী-চাঁদের যে কক্ষপথ রয়েছে তাতে বিভব শক্তি কমে যায়। এর কারণে এই দুইটি জ্যোতিষ্কের মধ্যে দূরত্ব প্রতি বছর ৩.৮ সেন্টিমিটার করে বেড়ে যায়। যতদিন না পৃথিবীতে জোয়ার-ভাটার উপর চাঁদের প্রভাব সম্পূর্ণ প্রশমিত হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত চাঁদ দূরে সরে যেতেই থাকবে এবং যেদিন প্রশমনটি ঘটবে সেদিনই চাঁদের কক্ষপথ স্থিরতা পাবে। চাঁদের দুই পার্শ্বসম্পাদনা
চাঁদের ঘূর্ণনটি সঙ্কালিক অর্থাৎ ঘূর্ণনের সময় সবসময় চাঁদের একটি পৃষ্ঠই পৃথিবীর দিকে মুখ করা থাকে। চাঁদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এর ঘূর্ণন ধীরতর হতে হতে একটি নির্দিষ্ট গতিতে এসে locked হয়ে যায়। পৃথিবী দ্বারা সৃষ্ট জোয়ার-ভাটা সংক্রান্ত বিকৃতির সাথে সম্পর্কিত ঘর্ষণ ক্রিয়ার কারণেই এই লকিং সৃষ্টি হয়। উপরন্তু, চান্দ্র কক্ষপথের উৎকেন্দ্রিকতা থেকে যে ক্ষুদ্র পরিবর্তনের সৃষ্টি হয় তার কারণে পৃথিবী থেকে চন্দ্রপৃষ্ঠের শতকরা প্রায় ৫৯ ভাগ দৃশ্যমান হয়ে উঠে। এই পরিবর্তনের ক্রিয়াটিকে লাইব্রেশন বলা হয়। চাঁদের যে পৃষ্ঠটি পৃথিবীর দিকে মুখ করে থাকে তাকে নিকট পার্শ্ব বলা হয় এবং এর বিপরীত পৃষ্ঠটিকে বলা হয় দূর পার্শ্ব। দূর পার্শ্বের সাথে আবার অন্ধকারাচ্ছন্ন পার্শ্বের সাথে গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না। চাঁদের যে গোলার্ধে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে সূর্যের আলো পৌঁছায় না সে গোলার্ধকে অন্ধকারাচ্ছন্ন পার্শ্ব বলা হয়। ১৯৫৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের লুনা ৩ নামক নভোযান প্রথমবারের মতো চাঁদের দূর পার্শ্বের ছবি তুলেছিল। এই পার্শ্বের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এখানে একেবারেই কোনো মারিয়া (চাঁদের বিশেষ ভূমিরূপ, আক্ষরিক অর্থে সাগর) নেই।
মারিয়া
পূর্ণিমার সময় মানুষ পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে চাঁদের অপেক্ষাকৃত অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং স্বতন্ত্র ধরনের যে পৃষ্ঠগুলো দেখতে পায় তাদেরকে বলা হয় মারিয়া (maria, একবচন – mare)। লাতিন ভাষায় মারে শব্দের অর্থ সাগর। প্রাচীনকালে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এই অংশগুলো পানি দ্বারা পূর্ণ বলে ভাবতেন বিধায়ই এ ধরনের নামকরণ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে আর নামের পরিবর্তন করা হয়নি। সুপ্রাচীন ব্যাসল্ট দ্বারা গঠিত কঠিন লাভার পুকুর হিসেবে এগুলোকে আখ্যায়িত করা যায়। চাঁদের পৃষ্ঠের সাথে উল্কাএবং ধূমকেতুর সংঘর্ষের ফলে অনেক ইমপ্যাক্ট অববাহিকার সৃষ্টি হয়েছে। চাঁদের ব্যাসাল্টিক লাভার অধিকাংশ উৎক্ষিপ্ত হয়ে এই অববাহিকাগুলোর সাথে সম্পর্কিত নিম্নভূমির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল। এক্ষেত্রে একমাত্র ব্যতিক্রম হল Oceanus Procellarum। কারণ এর সাথে কোন ইমপ্যাক্ট অববাহিকার সম্পর্ক নেই। মারিয়ার অধিকাংশ চাঁদের নিকট পার্শ্বে অবস্থিত।
পানির অস্তিত্ব
১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দের অ্যাপোলো অভিযানে চাঁদ থেকে আনা পাথরখণ্ড পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা প্রথম দাবি করেছিলেন যে, চাঁদে পানি রয়েছে। তারপর ভারত তাদের প্রথম চন্দ্রাভিযানের (চন্দ্রযান-১) পর একই দাবি করে। ভারতীয় বিজ্ঞানীরা চন্দ্রযান-১ ছাড়াও দুটো মার্কিন নভোযানের (ডিপ ইমপ্যাক্ট ও ক্যাসিনি) পাঠানো উপাত্ত বিশ্লেষণ নিশ্চিত হয়ে এমন দাবি উত্থাপন করেন। ভারতীয় নভোযানটি নাসা'র সরবরাহকৃত চন্দ্রপৃষ্ঠের ২-৩ ইঞ্চি গভীরে অনুসন্ধানক্ষম মুন মিনারেলজি ম্যাপার(এম৩) নামক একটি যন্ত্রের সহায়তায় চন্দ্রপৃষ্ঠের মেরু অঞ্চলে সূর্যের প্রতিফলিত আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য পরীক্ষা করে প্রমাণ পায় যে চাঁদের মাটির ১০,০০,০০০ কণায় পানির কণা হলো ১,০০০। গবেষণায় চন্দ্রপৃষ্ঠের পাথর ও মাটিতে প্রায় ৪৫% অক্সিজেনের প্রমাণ মিলেছে। তবে হাইড্রোজেনের পরিমাণ গবেষণাধীন রয়েছে (২০০৯)। অবশ্য গবেষণায় এও বলা হয় যে, চাঁদের মেরু অঞ্চলের নানা গর্তের তলদেশে বরফ থাকলেও চাঁদের অন্য অঞ্চল শুষ্ক।
জোয়ার-ভাটা
পৃথিবী-চন্দ্র সমাহারের অবিরত পরিবর্তন হচ্ছে। জোয়ার-ভাটার সাথে এর সম্পর্ক রয়েছে। চাঁদের আকর্ষণে চাঁদের দিকে অবস্থিত সমুদ্রের পানি তার নিচের মাটি অপেক্ষা বেশি জোরে আকৃষ্ট হয়। এ কারণে চাঁদের দিকে অবস্থিত পানি বেশি ফুলে উঠে। আবার পৃথিবীর যে অংশে অবস্থিত পানি চাঁদের বিপরীত দিকে থাকে, সেদিকের সমুদ্রের নিচের মাটি তার উপরের পানি অপেক্ষা চাঁদ কর্তৃক অধিক জোরে আকৃষ্ট হয়। কারণ এই মাটি পানি অপেক্ষা চাঁদের বেশি নিকটবর্তী। ফলে সেখানকার পানি মাটি থেকে দূরে সরে যায় অর্থাৎ ছাপিয়ে উঠে। এক্ষেত্রে ফুলে উঠার কাহিনীটিই ঘটে। পৃথিবী যে সময়ের মধ্যে নিজ অক্ষের চারদিকে একবার আবর্তন করে (এক দিনে) সে সময়ের মধ্যে পৃথিবীর যে-কোন অংশ একবার চাঁদের দিকে থাকে এবং একবার চাঁদের বিপরীত দিকে থাকে। এ কারণে পৃথিবীর যে-কোন স্থানে দুইবার জোয়ার এবং দুইবার ভাটা হয়।
তবে জোয়ার-ভাটার জন্য সূর্যের আকর্ষণও অনেকাংশে দায়ী। তবে অনেক দূরে থাকায় সূর্যের আকর্ষণ চাঁদের আকর্ষণের থেকে কম কার্যকর। সূর্য এবং চাঁদ যখন সমসূত্রে পৃথিবীর একই দিকে বা বিপরীত দিকে অবস্থান করে তখন উভয়ের আকর্ষণে সর্বাপেক্ষা উঁচু জোয়ার হয়, জোয়ারের পানি বেশি ছাপিয়ে পড়ে। এই অবস্থাকে ভরা কাটাল বা উঁচু জোয়ার বলা হয়। আর পৃথিবীকে কেন্দ্র করে সূর্য এবং চাঁদের মধ্য কৌণিক দূরত্ব যখন এক সমকোণ পরিমাণ হয় তখন একের আকর্ষণ অন্যের আকর্ষণ দ্বারা প্রশমিত হয়। তাই সবচেয়ে নিচু জোয়ার হয় যাকে মরা কাটাল বলে আখ্যায়িত করা হয়। জোয়ার বলতে আমরা শুধুমাত্র সমুদ্রের পানির স্ফীতিকেই বুঝি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে চাঁদ-সূর্যের আকর্ষণে পৃথিবীর স্থলভাগেও অনুরূপ প্রভাবের সৃষ্টি হয়। তাই বলা যায় , জোয়ার -ভাটার ক্ষেত্রে চাঁদ ও সূর্য এবং এদের মধ্যকার আকর্ষন বল ও অবস্থান মুখ্য ভুমিকা পালন করে।

0 comments:
Post a Comment